মানুষ মাত্রই বিনোদন প্রত্যাশী । দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় কর্মক্লান্তি শেষে আমরা সকলেই সুস্থ, সুন্দর ও পরিশীলিত চিত্তবিনোদনের প্রত্যাশা করি । মানুষের প্রত্যাশা থেকেই যুগে যুগে চিত্তবিনোদনের ক্ষেত্র হয়েছে প্রসারিত, সমৃদ্ধ হয়েছে আমাদের প্রাত্যহিক যাপিত জীবন । সঙ্গত কারণেই বিনোদন ক্ষেত্রের সাথে জড়িত মানুষের (এন্টারটেইনার) সাথে রচিত হয়েছে আমাদের আত্মিক বন্ধন । আধুনিক যুগে এই বন্ধনের পরিভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ফ্যান (ভক্ত) শব্দটি ।
আমরা প্রত্যেকেই বিনোদন জগতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ ব্যাক্তি বা গোষ্ঠীর ভক্ত; হোক সেটি চলচ্চিত্রাঙ্গন, সঙ্গিতাঙ্গন কিংবা ক্রীড়াঙ্গন । আমরা প্রত্যেকেই যেমন স্বতন্ত্র তেমনি আমাদের পছন্দ, অপছন্দ ও চিন্তাধারার ক্ষেত্রেও রয়েছে স্বকীয়তা । আর এই স্বকীয়তায় মানুষের মেধা, মনন ও হৃদয়কে করে তোলে অনন্য ।
আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপের ২১তম আসর নিয়ে পুরো বিশ্বে চলছে বিশ্বকাপের আমেজ । যদিও বাংলাদেশ এখন অব্দি বিশ্বকাপ ফুটবলে নিজেদের মেলে ধরতে পারে নি, তবুও নান্দনিক এই আয়োজনের সাক্ষী হতে প্রতি বারের ন্যায় এবারো আমাদের প্রস্তুতির কোন কমতি নেই; কখনো ছিল না ।
স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ থেকে শুরু করে চায়ের দোকান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্রই আমরা আমাদের নিজেদের পছন্দের দল/খেলোয়াড়ের শ্রেষ্টত্ব প্রমাণে ব্যস্ত । বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে মহাসমারোহে বিশ্বফুটবলের মোড়লদের ভক্তরা গড়ে তুলছে নিজ নিজ সমর্থকগোষ্ঠীর সংগঠন ।
চাঁদা তুলে জার্সি বানাতে, গ্রাম, পাড়া, মহল্লা ও হলের দেয়াল রাঙাতে কিংবা বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা করতে চলছে নানা আয়োজন । পাড়ায়-পাড়ায়, গ্রামে-গ্রামে, মফস্বল শহর থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে চলছে বড় বড় পতাকা বানানোর প্রতিযোগিতা । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে শুরু হয়েছে বিভিন্ন দলের সমর্থক গোষ্ঠীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক পোলের (ভোটগ্রহণ) ব্যবস্থা। নিজদের দলের সমর্থক সংখ্যায় বেশি দেখার আনন্দটা যেনো বিশ্বকাপ জয়ের থেকে কোন অংশেই কম না !
বিভিন্ন দলের সমর্থকদের মধ্যে অহর্নিশ বাকযুদ্ধ মহামারী আকার ধারণ করেছে । নিজ নিজ দলের সাফল্যের খতিয়ান নিয়ে একে অন্যের দলকে ধুয়ে দিতে কার্পণ্য বোধ করছে না কেউই । একে অপরে পছন্দের দল কে সবার উর্ধে তুলে ধরতে কত যুক্তিতর্কই না তুলে ধরছি আমরা । যদিও বিষয়টা খুবই উপভোগ্য এবং নিছক আনন্দের জন্য তবুও সেটি কখনো কখনো সকল সীমা অতিক্রম করে মারাত্মক সব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটানার জন্ম দিতে পারে; ঘটাতে পারে প্রাণনাশের মতো অপ্রত্যাশিত ঘটনাও ।
এখানে স্মরণযোগ্য গত বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাবলীঃ ২০১৪ সালের জুন মাসেই মারা যায় সাত জন এবং আহত হয় অন্তত একচল্লিশ জন। তন্মধ্যে,মোট চারজন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়। উল্লেখ্য, এর মধ্যে তিন (ঢাকা জেলার দুই এবং কিশোরগঞ্জ জেলার এক) জন আর্জেন্টিনার সমর্থক বিশ্বকাপ খেলার উদ্ভোবনী পর্ব শুরু হওয়ার আগেই পতাকা টানাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়।
অন্যদিকে জার্মানির সাথে ব্রাজিলের বড় ব্যবধানে হেরে যাওয়ায় নোয়াখালী জেলার স্বপন নামের একলোক হার্ট এট্যাক করে মারা যান। রাত জেগে খেলা দেখার জন্য বউয়ের হাতে খুন হন বড়াইগ্রাম উপজেলার সেলিম হোসেন । এছাড়াও ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হন লালমনিরহাট জেলার মিলন হোসেন নামের এক যুবক।
বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যগাজিনেও ১৯শে জুন ২০১৪ সালে বাংলাদেশে ঘটে আরেকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার উদ্ধতি করে বলা হয়, “আপনারা কখনো ভাবতে পারবেন না পৃথিবীর এমন সব জায়গায় আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের উগ্র সমর্থক রয়েছে” । এ প্রসঙ্গে আরো বলা হয়, জুনের ৭ তারিখে ব্রাজিল আর্জেন্টিনার সমর্থকরা সংঘাতে লিপ্ত হয় এবং সংঘাতটি রিও ডি জেনিরো কিংবা বুয়েন্স আয়ার্সে হয়নি, হয়েছে বাংলাদেশের বরিশালে ।
আমাদের দেশে বিশ্বকাপ খেলা দেখার জন্য ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা পিছানোর নজিরও আছে । প্রসঙ্গত, গত ২০১৪ সালে বিশ্বকাপের ২০তম আসরে মাগুরা জেলার একজন কৃষক জার্মানির সমর্থনে নিজের জমি বিক্রি করে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ করে আনুমানিক সাড়ে তিন কিলোমিটার দৈর্ঘ্য পতাকা তৈরী করে যেটি খুবই আলোচনার জন্ম দেয় ।
পরবর্তীতে বিষয়টি বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মানির রাষ্ট্রদূতের দৃষ্টিগোচরে এলে তিনি তাঁকে জার্মানি ফ্যান ক্লাবের আজীবন সদস্যপদ প্রদান করেন । পত্রিকা মারফৎ জানতে পারলাম, এবছর তিনি সাড়ে পাঁচ কিঃ মিঃ পতাকা বানানোর প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং তার ( জীবনের শেষ) ইচ্ছা ১৭ কিঃ মিঃ দৈর্ঘ্যের জার্মান পতাকা নির্মাণ করা; যেটি তার নিজ জেলার থেকে পার্শ্ববর্তী জেলাকে সংযুক্ত করবে !
আমরা নিজেরাও হয়তো জানি না যেসব দেশ বা খেলোয়াড় নিয়ে আমরা এতোটা উন্মাত্ততা প্রকাশ করছি, যাদের শ্রেষ্টত্ব প্রমাণে বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজনে, প্রতিবেশী একে অপরের প্রতি কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি করছি, বিষেদাগার উগ্রে দিচ্ছি, সেই দেশের নাগরিকেরা না হোক খেলোয়াড়েরা কি অন্তত আমাদের দেশের নামটা পর্যন্ত জানে? সেদিকে না হয় নাই গেলাম, এতো কিছুর বিনিময়ে আমাদের প্রাপ্তি বলতে গেলে ‘আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের উগ্র সমর্থক’ হিসেবে আন্তর্জাতিক মিডিয়াত পরিচিতি !
প্রশ্ন হলো, জাতি হিসেবে আমরা কী তবে এতটায় উন্মাদ যে স্রেফ খেলার ক্ষেত্রেও আমরা আমাদের আবেগ সংবরণ করতে ব্যর্থ হব ? কেনই বা আমরা আমাদের সীমাটা জানি না ? এ প্রসঙ্গে সোলাইমান সুখন এর একটি উক্তির অবতারণা করা যেতে পারে । কথা প্রসঙ্গে কোন একটি ভিডিও ব্লগে তিনি বলেছিলেন, “আমরা সবাই ভুল শিরোনামে অভ্যস্ত”।
আমরা ভুল মানুষ, ভুল বিষয় কিংবা ভুল জিনিসকে সেলিব্রেট করি । আমরা ‘এন্টারটেইনার’ আর ‘স্টার’ প্রত্যয় দুটির পার্থক্য বুঝতে অপারগ । শুধু মাত্র যারা এন্টারটেইনমেন্ট বা বিনোদন (চলচ্চিত্রাঙ্গন, সঙ্গিতাঙ্গন অথবা ক্রীড়াঙ্গন ও অন্যান্য) ক্ষেত্রে নিজেদেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, তাদেরকেই আমরা স্টার/সেলিব্রেটি মনে করছি, তাদেরকেই রোলমডেল ভাবছি, তাদের সাফল্য ব্যর্থতায় নিয়ত উৎযাপন করছি ।
আমাদেরকে ভিনদেশের ফুটবল একাদশের খেলোয়াড়দের নাম বলতে বললে শুধু নাম নয়; ফুটবলে তাদের কৃতিত্ব এক নিঃশ্বাসে বলে দিতে পারব । কিন্তু দেশে বরেণ্য দশজন গবেষকের নাম বলতে বললে মুখ কাঁচুমাচু করব ।
আজ আমরা আমাদের ডিজিটাল প্রোফাইলের কাভার ফটোতে মেসি, রোনালদো কিংবা নেইমার এর ছবিতে সুসজ্জিত রাখি; বস্তুত যারা স্রেফ এন্টারটেইনার বৈ কিছুই নয় । বাস্তবে যাদের কোনো ভূমিকায় নেই আমাদের জাতীয় ও ব্যক্তিজীবনে, তাদেরকেই আমরা মাথায় তুলে রাখছি। ভিনদেশী এন্টারটেইনারদের সাফল্যে উচ্ছ্বাসিত হওয়া যায়, উল্লাসে ফেটে পড়া যায়; কিন্তু তাদেরকে নিয়ে উগ্র ও নগ্ন বাকযুদ্ধ, বিবাদ, মারামারি, কিংবা হানাহানি কতটা যুক্তিযুক্ত?
আমাদের জীবনে অবশ্যই বিনোদনের দরকার আছে। সুস্থ-সবল স্বাভাবিক জীবনের জন্য খেলাধুলা ও নিয়মিত ব্যায়াম অপরিহার্য্য। সেইসাথে সবকিছু উৎসবমুখরভাবে পালন করারো যোক্তিকতা আছে যা আমাদের একতা, ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে এবং উন্নত দেশের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে সহয়তা করে। সেই সাথে আমাদের অর্থনীতির গতিবিধি সচল রাখে।
প্রতিটা বিষয়ে আমাদের আগ্রহ থাকবে এটাই স্বাভাবিক এবং এই আগ্রহ থাকাটাও জরুরী বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য । কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে আমরা যেন সীমালঙ্ঘন না করি এবং এন্টারটেইনারদের শ্রেষ্টত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম না দেই ।
আমরা আশাবাদী, এসকল নগণ্য ব্যাপারগুলোতে সংঘাত এড়িয়ে চলতে পারবো, নিজের এবং অন্যের প্রিয় দল ও খেলোয়াড়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ প্রদর্শন করতে সমর্থ হব; নিজের এবং অন্যের বিন্দু মাত্র স্বার্থ খর্ব না হয় সেদিকে খেয়াল রেখেই আমরা বিশ্বকাপের উন্মাদনায় মেতে উঠবো । পরিশেষে একটা কথায় বলব, ‘এন্টারটেইনারস্’ আর নট অলওয়েজ ‘স্টারস্’, লেটস্ সেলিব্রেট দ্যা রিয়েল স্টারস্ ।
লেখক: আসিফ মাহমুদ
সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা
ফল-মূল বাজার ডট কম




















